August 6, 2020, 7:12 am


নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসকের অনিয়ম ও দুর্নীতি :দুদকের অনুসন্ধান শুরু

প্রতিনিধি:
চিকিৎসক সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম আবাসিক চিকিৎসক পদে যোগদানের পর নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে সব ধরনের কাজে বড়ই অনিয়ম,দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অস্থিরতা ও স্থবিরতা দেখা দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে।
জানা গেছে, তিনি প্রথমে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। পরে চলতি দায়িত্বে আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা পদে আসিন হন। অভিযোগ ওঠেছে, এ পদে দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর থেকে হাসপাতালের সব ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা ও স্থবিরতা নেমে আসে। বিনষ্ট হয় হাসপাতালের সুস্থ্য পরিবেশ। দালাল আর অনিয়মের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয় এখানকার সব কিছু।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর প্রকাশিত হলেও তাতেও বিন্দুমাত্র তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি হাসপাতালের চিত্র। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, একজন আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা হিসেবে সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম যথাসময়ে নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি হাসপাতালের নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে অনেকটা মনগড়া ও দায়সারাগোছে আসা যাওয়া করছেন।
দেশে যখন করোনা ভাইরাস ও ডেঙ্গু আতঙ্ক জনমনে, ঠিক তখনই নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের পরিবেশ হয়ে ওঠেছে ডেঙ্গু প্রজননের জন্য আদর্শস্থল। জেলার সচেতন নাগরিক রবিউল হাসান বলেন, হাসপাতালে সার্বিক অবস্থা দেখাশোনার কথা আবাসিক চিকিৎসক কর্মর্তার। কিন্তু সেদিকে কোন খেয়াল নেই তার।
হাসপাতালের ইনডোরের পাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় পানি জমাট হয়ে থাকে সর্বদাই। এসবের প্রতিকারে তার কিছুই যেন যায় আসেনা। তাছাড়া হাসপাতালের অভ্যন্তরে দালাল ও হকারদের কাছ থেকে নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ভেতরে আসা যাওয়ার সুযোগ করে দেন আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা। এরফলে হাসপাতালের আন্ত:বিভাগে ঢুকে রোগীর শয্যার পাশে গিয়ে দালাল ও হকার চিকিৎসা কর্মে বিরক্তি ঘটাচ্ছেন।
এদিকে আবাসিক চিকিৎসকের দায়িত্বহীনতার কারণে হাসপাতালের সামনে গড়ে ওঠেছে গোচারণ ভূমি। এর ফলে পুরোনো পরিত্যক্ত ভবনের ভেতরে যত্রতত্র গরুর মলমূত্র নিত্যদিনের ঘটনা। হাসপাতালে অভ্যন্তরে অ্যাম্বুলেন্স রাখার কোন নিয়ম না থাকলেও তার ছত্রছায়ায় হাসপাতালের আঙ্গিনায় গড়ে ওঠেছে অবৈধ সিএনজি ও অ্যাম্বুলেন্স রাখার অবৈধ পার্কিং। এর ফলে জরুরী রোগীর অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি ঢুকতে প্রায়সই বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে, জরুরী প্রয়োজনে তার সাথে সাক্ষাৎ প্রত্যাশী সাধারণ রোগী ও স্বজনরা তার কক্ষের সামনে অসহায়ত্বের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার সাথে আড্ডা দেয়া বিভিন্ন লোকজন নিজেদেরকে তার বন্ধু পরিচয়ে, কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বরত কর্মচারী এমনকি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধোর ও অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে।
তাছাড়া আবাসিক চিকিৎসক গরীব, অসহায় ও দু:স্থ রোগীদের নাম করে হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতি থেকে অর্থ আত্মসাত করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। নামে বেনামে আবেদনপত্র পূরণ করে আবেদনকারীর স্বাক্ষর এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকের স্বাক্ষর ছাড়াই ফরম অনুমোদন করেন তিনি। পরে ওই টাকা ওঠিয়ে নিজের পকেটে নেন।
অভিযোগ রয়েছে, সার্টিফিকেট বাণিজ্য এ হাসপাতালের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য! আবাসিক চিকিৎসকের আয়ের অন্যতম উৎস এই সার্টিফিকেট বাণিজ্য। সাধারণ ও জরুরী যে কোন চিকিৎসাধীন রোগীর সার্টিফিকেটের জন্য তাকে দিতে হয় বাধ্যতামূলক অর্থ। তা না হলে মিলেনা সার্টিফিকেট।
এ বিষয়ে নলুয়ার রহিম উল্যাহ, মোজাম্মেল ও আবদুল হক বলেন, বর্তমান আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিমের সার্টিফিকেট বাণিজ্য হয় ভিন্ন কৌশলে। প্রথমে সাধারণ মানুষকে আইনের দোহাই দিয়ে সার্টিফিকেট না দেয়ার যৌক্তিকতা দেখান। এরপর ২/৩ দিন ঘুরতে হয় তার কাছে। আর চুক্তি ও কথাবার্তা চূড়ান্ত করতে হয় তার কার্যালয়ের দায়িত্বরত এক অফিস সহায়কের সাথে। কাজ কারবার চূড়ান্ত করার পরই মেলে সার্টিফিকেট। জানা যায়, অর্থের বিনিময় না করলে কাউকে দিয়ে তদবির করেও সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব হয়না।
সূত্র জানায়, প্রতিটি সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য প্রথমে ২/৩ দিন ঘুরানো শেষে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার মতো অর্থ লেনদেনের ঘটনা নিত্যদিনের বিষয়। হাসপাতালের কেবিন পেতেও রীতিমত অতিরিক্ত অর্থ বিনিময় একটি নিত্যদিনের ঘটনা। তার অর্থ বাণিজ্যের আরেক শিহরিত ঘটনা হচ্ছে পোস্টমর্টেম বাণিজ্য। মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ছাড়াও খুব সহজে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া যায় না তার কাছ থেকে।
কবির হাটের শহিদ মিয়া বলেন, পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া মানুষটাকে নিয়েও চলে তার বাণিজ্য। যা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
এনিয়ে আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম বলেন, তার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগই অসত্য।
এদিকে জেনারেল হাসপাতালের ৭ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও আত্মসাতের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে।
২২ জুলাই বিকেলে জেলা দুদক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালী দুদকের সহকারী পরিচালক ও তদন্ত টিমের প্রধান সুবেল আহমেদ’র নেতৃত্বে গঠিত টিম বুধবার থেকে এ অনুসন্ধান শুরু করেছেন ।
দুদকের এই অনুসন্ধান টিমের অন্য সদস্যরা হচ্ছেন, ডা. নিজামুদ্দিন উপ-পরিচালক, সিএমএইচডি ঢাকা, ডা. আহসানুল হক সহকারী পরিচালক, হাসপাতাল -৪ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা, ডা. শহিদুল ইসলাম সহযোগী অধ্যাপক, রেডিওলোজী বিভাগ,শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ঢাকা, নাশিদ রহমান সহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রনিকস) নিমিউ এন্ড টি সি ঢাকা,ডা. সুরজিত দত্ত ডিপিএম হাসপাতাল ঢাকা।
জেলা দুদক কার্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে এক্টউইল টেকনোলজি (বিডি) লিমিটেড কর্তৃক সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতি, সিএমএসডি কর্তৃক কার্যাদেশ নং সিএমএসডি /প্রকিউর/৫৬ এইচপিএন এসডিপি/জি ১৫২৩ (আইসিবি)২০১৫৮-২০১৬/ডি /৫৫ মূলে মেসার্স বেংগল সাইন্টিফিক এন্ড সার্জিকাল কোং কর্তৃক সরবরাহকৃত সি আর এক্সরে মেশিনসহ সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতির মূল্য যাচাই সম্পর্কে দুদক স্বাস্থ্যবিভাগের একটি উচ্চপদস্থ টিম নিয়ে সরেজমিনে বুধবার থেকে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
জেলা দুদক কার্যালয় সূত্রে আরও জানা যায, দুদকের সহকারী পরিচালক সুবেল আহমেদ’র নেতৃত্বে বিশষজ্ঞ টিম বুধবার হাসপাতালে এসে দেখতে পায় প্রায় ৩৫লক্ষ টাকা মূল্যের একটি সি আর এক্সরে মেশিন -৫০০ অকেজো অবস্থায় পরে আছে যা প্রায় ৫ বছর সরবরাহ নেওয়ার পর থেকে একদিনও ব্যবহার হয়নি। এছাড়া ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে সরবরাহ নেয়া অটোমেশন, পোর্টাবেল ৪-ডি আল্ট্রাসনোগ্রাফি, আইসিইউ বেড,ডেন্টাল চেয়ার সহ যন্ত্রপাতি সরবরাহ নেয়া পণ্যের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক পাওয়া যায় নি। যার মূল্য অভিযোগকারী তার অভিযোগে ৭ কোটি টাকা উল্ল্যেখ করেছেন।
নোয়াখালী দুদকের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, অনুসন্ধান শুরু হয়েছে মাত্র, অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। অনুসন্ধান শেষে এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সংবাদ পড়তে লাইক দিন ফেসবুক পেজে