October 18, 2020, 2:43 am


মহামারীতে প্রেম ও শরৎবাবু

মিরন মহিউদ্দীন

জাহাজে ডেকের যাত্রী হয়ে রেঙ্গুনের পথে ভেসে চলেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার প্লেগের উদ্ধত থাবা এড়াতে, মৃত্যু থেকে বাঁচতে বার্মার দিকে। আর পথে প্রেমে পড়লেন। এক সহযাত্রিনীর প্রেমে। মানুষের ইতিহাসে মহামারী ও প্রেম চলেছে পাশাপাশি। মানুষ যত অসহায়, নিঃসঙ্গ, সমাজ আর সংসারের নিশ্চয়তা থেকে চ্যুত, যত তার সামনে ফণা তুলে দাঁড়ায় কোনো প্রবল মহামারীর পরিব্যাপ্ত বিপর্যয়, ততই যেন ঘনতা আসে নারী-পুরুষের সম্পর্কে। আজকের করোনা পরিস্থিতিতে ফিরে দেখা শরৎবাবুর ‘শ্রীকান্ত’।

কলকাতায় দেখা দিয়েছে অপ্রতিরোধ্য প্লেগ। উজাড় হয়ে মরছে মানুষ। লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সমাজ, সংসার, সন্নিধ্য। কে কাকে দেখবে, সেবা করবে, ঠিক নেই। নিজেকে বাঁচানোর একমাত্র তাগিদে পিলপিল প্রাবল্যে পালাচ্ছে মানুষ। তবু যারা পারল না পালাতে, থেকে গেল নিরুপায় হয়ে কলকাতায়; প্লেগের উদ্ধত থাবার সামনে সেসব নিয়তি-নির্জিত মানুষের আর্তনাদে ত্রুমশ ভরে উঠছে কলকাতা।
এমন এক মহামারীর বিপর্যয়ের মধ্যে ভোরবেলা একটি লোহার তোরঙ্গ ও বিছানাপত্তর নিয়ে কলকাতার কয়লাঘাটে ঠেলাঠেলি ভিড়ের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়! সবাই পালাচ্ছে কলকাতা থেকে, মৃত্যুভয়ে। শরৎচন্দ্র কিন্তু পালাচ্ছেন না। তিনি ভবঘুরে মানুষ। আশ্চর্য এক বাঙালি, যাঁর মরতে ভয় নেই। তিনি এসেছেন বর্মার জাহাজ ধরবেন বলে। কয়লাঘাট থেকে পাড়ি দিচ্ছেন রেঙ্গুন। পেটের দায়ে। চাকরির সন্ধানে। জাহাজে উঠতে গিয়েই বুঝলেন, ব্যাপারটা অত সহজ হবে না। মুখে মুখে কথাটা রটে গেল, সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ ‘ডগ্দরি হোগা’। অর্থাৎ, ডাক্তারি হবে। ‘পিলেগ্কা ডগ্দরি।’ কলকাতায় যেহেতু ছড়াচ্ছে প্লেগের মহামারী, বাঙালি পালাচ্ছে বর্মায়। কারণ সেখানে এখনও প্লেগ নেই। কিন্তু সেখানে যে ক’দিনের মধ্যেই প্লেগের প্রাদুর্ভাব হবে, তা বেশিরভাগ মানুষই জানে না।
লিখছেন শরৎচন্দ্র : কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘাটে সাহেব ডাক্তারের আবির্ভাব হল। এবং যাত্রীদের গোপন অঙ্গই বেশি টেপাটিপি করতে লাগল। কেউ কিন্তু প্রতিবাদের টুঁ শব্দটি করল না। কেউ পাস করল ডাক্তারের পরীক্ষায়। কেউ ফেল। যারা ফেল, তাদের বর্মা যাওয়া হল না। এক সময়ে শরৎচন্দ্রের দিকেও হাত বাড়ালেন সাহেব ডাক্তার। শরৎ জানাচ্ছেন, ‘যথাসময়ে চোখ বুজিয়া সর্বাঙ্গ সঙ্কুচিত করিয়া একপ্রকার মরিয়া হইয়াই ডাক্তারের হাতে আত্মসমর্পণ করিলাম, এবং পাশ হইয়াও গেলাম।’
জাহাজে ডেকের যাত্রী হয়ে রেঙ্গুনের পথে ভেসে চললেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার মহামারী থেকে বর্মার মহামারীর দিকে। আর পথে প্রেমে পড়লেন। এক সহযাত্রিনীর প্রেমে। মানুষের ইতিহাসে মহামারী ও প্রেম চলেছে পাশাপাশি। মানুষ যত অসহায়, নিঃসঙ্গ, সমাজ আর সংসারের নিশ্চয়তা থেকে চ্যুত, যত তার সামনে ফণা তুলে দাঁড়ায় কোনো প্রবল মহামারীর পরিব্যাপ্ত বিপর্যয় ও ধ্বংস, ততই যেন ঘনতা আসে নারী-পুরুষের সম্পর্কে। প্রেম হয়ে ওঠে ততই অনিবার্য ও অমোঘ! মনে পড়ে যাচ্ছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’-র সেই অসামান্য প্রেমের গল্প, ফ্লোরেনটিনো ও ফারমিনার তীব্র প্রণয়। কলেরা-মহামারীর প্রবল প্রেক্ষিতে। মনে পড়ে যাচ্ছে, আলবেয়ার কামূ-র ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসে মহামারী, মানুষের নিঃসঙ্গতা ও শহর-জোড়া লকডাউনের মধ্যে ওরান্-বাসীদের প্রেমতৃষ্ণা। মনে পড়ছে সমারসেট মম-এর ‘দ্য পেন্টেড ভেল্’ উপন্যাসে একই সঙ্গে মহামারী ও মহাপ্রেমের কাহিনী। মহামারী ও ভালবাসাকে পরস্পরের কাছে থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া যায় না। অচেনা-অজানা ভবিষ্যতের দিকে ভাসতে ভাসতে জাহাজে কেমন মেয়ের প্রেমে পড়লেন শরৎচন্দ্র? জানা যাক শরৎচন্দ্রের কাছ থেকেই : ডেকের এক কোণে কতকগুলো কাছি বিড়ের মতো করে রাখা। তারই মধ্যে একটি ময়লা জীর্ণ শতরঞ্চির উপর বসে এক বাঙালি তরুণী। কাছে যেতে মেয়েটি মাথায় কাপড় টানল বটে, কিন্তু তার বুদ্ধিদীপ্ত কপাল এবং সুন্দর মুখটি যেন ইচ্ছে করেই খুলে রাখল। মেয়েটির সিঁথিতে ডগডগে সিঁদুর। তার সুন্দর হাতটিতে নোয়া-শাঁখা। পরনে সাদাসিধে রাঙাপেড়ে শাড়ি। অত্যন্ত সুন্দরী মেয়ে বলতে বাঙালি যা বোঝে তা হয়তো নয়, কিন্তু মেয়েটির চোখে মুখে কপালে বুদ্ধির আলো। মেয়েটির অর্থের অভাব যতই প্রকট, তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ততই সাবলীল। শরৎ দেখলেন, তরুণীর সহযাত্রী এক যুবক। সে খুবই অসুস্থ। এবং শরৎ বুঝলেন, এই তরুণ-তরুণী স্বামী-স্ত্রী নয়। এরাও কি কলকাতার প্লেগ থেকে পালাচ্ছে? মেয়েটি নিজের পরিচয় দিয়ে বলল : আমার নাম অভয়া। আমার সঙ্গের মানুষটির নাম রোহিনী সিংহ। আমার বাড়ি বালুচরের কাছে। আর রোহিনীবাবু আমার প্রামসম্পর্কের ভাই। আমি রোহিনীবাবুকে নিয়ে বর্মা যাচ্ছি, কারণ বর্মায় আমার স্বামী ছ’বছর হল নিখোঁজ।
অভয়ার কথা শেষ হতে না হতেই জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে বিপুল দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেল। কারণ একটি অপ্রত্যাশিত ঘোষণা: কেরেটিন। কেরেটিন। অর্থাৎ, কোয়ারেন্টিন। অন্তরিন বা সঙ্গরোধ। জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং ডাক্তার যাকে মনে করবেন তাকেই গৃহবন্দি করতে পারবে। শহরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ডাক্তার শরৎচন্দ্রকে জানালেন, আপনার অবিশ্য কোনো ভয় নেই আপনাকে আমি ছাড়পত্র দিয়ে দেব। সোজা রেঙ্গুন শহরে ঢুকে যাবেন। শুধু ওই মেয়েটার সঙ্গে ভিড়বেন না। ওদের জন্য শহরের বাইরে অন্য ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা আপনি সহ্য করতে পারবেন না। কলকাতায় তো প্লেগ ভয়ংকর আকার নিয়েছে। সাবধান তো হতেই হবে। পরের দিন বেলায় জাহাজের গায়ে একটা স্টিমার এসে ভিড়ল। যারা গৃহবন্দি, তাদের চলে যেতে হবে এই স্টিমারে করে এক ভয়ংকর অজানা জায়গায়। শরৎচন্দ্র ঠিক করলেন, তিনি অভয়ার সঙ্গে স্টিমারেই উঠবেন। এবং করলেনও তা-ই। অভয়ার হাত ধরে নামলেন সেই অজ্ঞাত পরিবেশে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। পায়ের নিচে ধু ধু বালির আগুন। শরৎ আর অভয়া হাঁটছেন। হাঁটছেন ভীষণ বেদনার এক ভবিষ্যতের দিকে। গভীর আর্তিময় এক অনিশ্চয়তার দিকে। এবং ক্রমে ঘনিয়ে ওঠা এক মহামারীর পথে। শরৎ আর অভয়া, দু’জনেই যেন বুঝতে পারেন, মহামারী জিতবে না। জিতবে তাঁদের প্রেম। মিলনে না জিতুক, বিরহে তো জিতবেই। পরবাসে, পরিব্যাপ্ত মহামারীর মধ্যে, তাঁরা যত কষ্টই পান না, সেই দুঃখের মধ্যেই বেঁচে থাকার সার্থকতা। শরৎচন্দ্র মহামারীর প্রেক্ষিতে এই প্রণয়কাহিনির শেষ কথাটুকু প্রকাশ করেননি পুরুষের কন্ঠে। ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ প্লেগ’-এর শেষ কথা বলছে বাঙালি মেয়েই, যেমন করে বাঙালি মেয়েই শুধু বলতে পারে ঃ শরৎবাবু, দুঃখ ভোগ করার মধ্যে একটা মারত্মক মোহ আছে। মানুষ তার বহু যুগের জীবনযাত্রার পথে এইটুকু সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছে, সব বিপর্যয়, মৃত্যু, ধ্বংস, মহামারীর মধ্য দিয়ে যেতে যেতে মানুষ এইটুকু অন্তত উপলব্ধি করেছে, দুঃখের মধ্যেই, যন্ত্রণার মধ্যেই জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। জীবনে এত দুঃখ পেয়েও এই বিশ্বাসেই বেঁচে আছি।
শরৎবাবু, আপনার অভয়া সত্যিই বিশ্বাস করে, জীবনের মানদন্ডে একদিকে যত বেশি দুঃখের ভার বাড়বে, অন্যদিকে আনন্দের ভারও জড়ো হবে। চারধারে এই যে মহামারীর পরিব্যাপ্ত মৃত্যু ও লুপ্তি, সেটাই শেষ কথা নয় শরৎবাবু। তারই মধ্যে মানুষের ভালবাসার প্রকাশ, মানুষের হৃদয়ের আলো- সেটাই শেষ কথা। সব মহামারী নতজানু অনন্ত জীবনে কাছে। শরৎবাবু, এই অনুভবেই মানুষের চিরদিনের দুঃখ মুক্তি গো। তার চিরকালের মুক্তি¯œান।

miron55mohiuddin@gmail.com

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সংবাদ পড়তে লাইক দিন ফেসবুক পেজে